দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় জনপদ সাতক্ষীরার শ্যামনগর। প্রকৃতির বৈরিতার সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করছেন এখানকার মানুষ। নোনাজলের অভিশাপ, বেড়িবাঁধে ভাঙন, ঘূর্ণিঝড়, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার বঞ্চনা-সব মিলিয়ে এখানে টিকে থাকাই মানুষের নিয়তি। বিশেষত নারী ও শিশুরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। শিশুদের শৈশব হারিয়ে যায় শ্রমে জড়িয়ে। লবণাক্ত পানির কারণে গর্ভপাত, জরায়ু সমস্যা, ডায়রিয়া, কলেরা,
আমাশয়সহ ছড়িয়ে পড়েছে নানা নোনা পানির অভিশাপ
রোগ উপজেলার পদ্মপুকুর, গাবুরা, রমজাননগর, কৈখালী, মুন্সীগঞ্জ ও গাবুরা ইউনিয়নে যেদিকে চোখ যায়, শুধু পানি আর পানি। কিন্তু খাওয়ার উপযোগী একটুও নেই। এখানকার বেশির
ভাগ পুকুর বা নলকূপের পানি লবণাক্ত। বর্ষায় বৃষ্টির পানি ধরে রেখে মাস ছয়েক চালিয়ে নিতে পারলেও বছরের বাকি সময় সুপেয় পানির তীব্র সংকটে ভোগেন বাসিন্দারা। তারা মাইলের পর মাইল হেঁটে কিংবা ভ্যান-সাইকেলে চড়ে ছোটেন সুপেয় পানির সন্ধানে। রান্নাবান্নাসহ দৈনন্দিন কাজে লবণাক্ত পানি ব্যবহারের ফলে অনেকেই উচ্চ রক্তচাপে ভোগেন। শ্যামনগরের বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের বাসিন্দা নমিতা বেগম বলেন, শীত-গ্রীষ্মেএখানে খাবার পানির হাহাকার দেখা দেয়। পানির সমস্যা সমাধানে সরকারি-বেসরকারি নানা প্রকল্প হলেও তা পর্যাপ্ত নয়। ফলে ডায়রিয়া, কলেরা, আমাশয়, জন্ডিস, চর্মরোগ এ এলাকার মানুষের নিত্যদিনের সঙ্গী। এক গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত লবণাক্ত পানি গ্রহণের ফলে জরায়ু রোগ, উচ্চ রক্তচাপ, গর্ভকালীন খিঁচুনি, গর্ভপাত, এমনকি অপরিণত শিশু জন্ম দেওয়ার হার বেড়েছে। এছাড়া নারীরা দৈনন্দিন গৃহস্থালি কাজ, গোসল, কৃষি কাজ, গবাদিপশু পালন, চিংড়ির পোনা ধরাসহ অন্যান্য অর্থনৈতিক কাজে লবণাক্ত পানি ব্যবহারের কারণে লিউকোরিয়াসহ পানিবাহিত ও চর্মরোগে আক্রান্ত হচ্ছেন।শ্যামনগর প্রেস ক্লাবের সভাপতি মাসুম বিল্লাহ জানান, এখানে ৬৫ বছর আগে ১৪৪ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ নির্মাণ হয়েছে। এরপর ছোট-বড় মিলিয়ে শতাধিক প্রাকৃতিক দুর্যোগ আঘাত হেনেছে। কিন্তু সেই অনুযায়ী বেড়িবাঁধ সংস্কার হয়নি। ফলে বিভিন্ন সময়ে জরাজীর্ণ বাঁধ ভেঙে প-াবিতহয়েছে উপকূলীয় এলাকা। এতে মানুষের জানমালের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ঘূর্ণিঝড় আইলায় সারা দেশে ১৯০ জনের প্রাণহানি ঘটে, যার মধ্যে শুধু শ্যামনগরেই ছিল ৫৭ জন উপকূলে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার সুযোগও খুব সীমিত। জেলেপল্লীর অধিকাংশ শিশু শৈশব থেকেই তারা মাছ ধরা, বিক্রি করা, ট্রলার বা নৌকা থেকে মাছ নামানো ইত্যাদি কাজে যুক্ত হয়ে যায়। যে বয়সে হাতে বই, কাঁধে স্কুল ব্যাগ থাকার কথা তখন ওদের পিঠে উঠে জাল আর হাতে মাছের ঝুড়ি। নদীর উত্তাল ঢেউয়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মাছ ও কাঁকড়া ধরাসহ নানা ঝুঁকিপূর্ণ কাজে জড়িয়ে যায় তারা। শ্যামনগর উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলীর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, উপজেলায় এক হাজার ৯৪৯টি গভীর, ৪৯১টি অগভীর, ৫০০টি এসএসটি ও ৪৪১টি ভিএসএসটি নলকূপ রয়েছে। এর মধ্যে আটটি গভীর, ১২৯টি অগভীর, ১৬টি এসএসটি ও ৪৪টি ভিএসএসটি নলকূপ কয়েক বছর ধরে অকেজো।